ধর্ম নির্ণয়ে বেদই একমাত্র প্রমাণ; পুরাণ এবং স্মৃতি সহায়ক মাত্র

বর্তমানে সনাতন ধর্মাবলম্বী কিছু ব্যক্তি প্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদকে পাশ কাটিয়ে শুধু পৌরাণিক গ্রন্থ অথবা বিভিন্ন বাবাগুরুদের লেখা ছড়ার বই, গ...

দণ্ড মহোৎসবের কথা।

 দণ্ড মহোৎসবের কথা

দণ্ড মহোৎসবের কথা  দণ্ড মহোৎসবের কথা    শ্রীচৈতন্যদেবের সন্ন্যাস নেয়ার পরে বাংলার বৈষ্ণব সম্প্রদায়কে সংগঠিক করার দায়িত্ব এসে পরে শ্রীনিত্যানন্দের উপরে। তিনি তৎকালীন বিভিন্ন বর্ণ থেকে আগত বৈষ্ণবদের ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে তাদের মধ্যে জন্মগত জাতিবর্ণ ভেদের সংস্কার থেকে উপরে উঠে সবাইকে একসাথে ভোজনের এক সর্বজনীন মহোৎসবের প্রবর্তন করেন ; সেই সর্বজনীন মহোৎসবের নামই দণ্ড মহোৎসব।তৎকালীন ষোড়শ শতাব্দীতে বঙ্গের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিলো সপ্তগ্রাম। তার খ্যাতি ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। সেই সপ্তগ্রামের জমিদার ছিলেন দুইভাই হিরণ্য এবং গোবর্দ্ধন ; তাদের দুইভাইয়ের বাৎসরিক আয় ছিলো বারো লক্ষ টাকা। এমনি সুবিশাল সম্পত্তির মালিক দুইভাইয়ের মধ্যে গোবর্দ্ধনের একমাত্র পুত্র হলো রঘুনাথ দাস। যিনি পরবর্তীকালে ষড়গোস্বামীদের অন্যতম হয়েছিলেন।পুরী থেকে শ্রীনিত্যানন্দকে নাম প্রচারের দায়িত্ব দিয়ে বাংলায় পাঠালেন শ্রীচৈতন্যদেব। নিত্যানন্দ স্বপারিষদ এসে উঠলেন গঙ্গাপারের পানিহাটির রাঘবভবনে। প্রতিদিনই ভক্তদের সাথে নাম সংকীর্তনে মগ্নচৈতন্য থাকেন নিত্যানন্দ। একদিন নিত্যানন্দ দেখলেন জমিদার পুত্র রঘুনাথ দাস দূর থেকে তাকে প্রণাম করছে তখন রসিক নিতাই সহাস্যে রঘুনাথদাসকে কাছে টেনে এনে বলেন: "তলে উপরে বহু ভক্ত হইয়াছে বেষ্টিত।  দেখিয়া প্রভুর প্রভাব রঘুনাথ বিস্মিত ৷৷  দণ্ডবৎ হইয়া পড়িলা বহুদূরে।  সেবক কহে রঘুনাথ দণ্ডবৎ করে।  শুনি প্রভু কহে চোরা দিলি দরশন।  আয় আয় আজি তোর করিব দণ্ডন।  প্রভু বোলায় তেঁহ নিকটে না করে গমন।  আকর্ষিয়া তার মাথে ধরিল চরণ।  কৌতুকী নিত্যানন্দ সহজে দয়াময়।  রঘুনাথে কহে কিছু হইয়া সদয় ৷৷  নিকটে না আইল চোরা ভাগে দূরে দূরে।  আজি লাগি পাইয়াছি দণ্ডিব তোমারে ।।  দধি চিড়া ভক্ষণ করাহ মোর গণে।  শুনিয়া আনন্দ হৈল রঘুনাথ-মনে ৷৷"  (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত: অন্ত্যলীলা, ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ) নিত্যানন্দের আদেশ মত জমিদার পুত্র রঘুনাথ দাস প্রত্যেক ভক্তের জন্য মাটির হাড়িতে পর্যাপ্ত চিড়ে দই বিভিন্ন রকমের ফলের আয়োজন করেন। "সেইক্ষণে নিজ লোক পাঠাইল গ্রামে।  লোক সব গ্রাম হইতে আনে ৷৷  চিড়া দধি দুগ্ধ সন্দেশ আর চিনি কলা।  সব দ্রব্য আনাইয়া চৌদিকে ধরিলা ।  মহোৎসব নাম শুনি ব্রাহ্মণ-সজ্জন।  আসিতে লাগিলা লোক অসংখ্য গণন।  আর গ্রামান্তর হইতে সামগ্ৰী আনিল।  শত দুই চারি তবে হোলনা আনাইল ৷৷  বড় বড় মৃৎকুণ্ডিকা আনাইলা পাঁচ সাতে।  এক বিপ্ৰ প্ৰভু লাগি চিড়া ভিজায় তাতে ।।  এক ঠাঞি তপ্ত দুগ্ধে চিড়া ভিজাইয়া।  অৰ্দ্ধেক ছানিল দধি চিনি কলা দিয়া ৷৷  অৰ্দ্ধেক ঘনাবৰ্ত্ত দুগ্ধেতে ছানিল।  চাঁপা কলা চিনি ঘৃত কর্পূর তাতে দিল ৷৷  ধুতি পরি প্রভু যদি পিণ্ডাতে বসিলা। সাত কুত্তী বিপ্র তাঁর আগেতে ধরিলা ।।  চবুতরা উপরে যত প্রভুর নিজগণ।  বড় বড় লোক বসিলা মণ্ডলী-রচন ৷৷  রামদাস সুন্দরানন্দ দাস গদাধর।  মুরারি কমলাকর সদাশিব পুরন্দর।।  ধনঞ্জয় জগদীশ পরমেশ্বর দাস।  মহেশ গৌরদাস হোড় কৃষ্ণদাস ৷৷  উদ্ধারণ-আদি যত আর নিজ জন।  উপরে বসিলা সব কে করে গণন ৷৷" (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত: অন্ত্যলীলা, ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ)  দিনটি ছিলো জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথি। সেই থেকে বৈষ্ণব সমাজে দিনটি ‘দণ্ড মহোৎসব’ নামে পরিচিত। ধনী ভক্তকে দিয়ে নিত্যানন্দ অর্থদণ্ডের ছলে মহোৎসবের আয়োজন করেছিলেন বলে এই উৎসবের নাম দণ্ড মহোৎসব। মূলত দণ্ডের ছলে কৃপাই এর প্রধান লক্ষ্য। বিষয়-সম্পত্তিকে লোককল্যাণে ব্যয় করে ভোগাসক্তি ত্যাগ করে জীবনে বৈরাগ্য নিয়ে আসা। নিত্যানন্দ প্রভুর এ দণ্ডে রঘুনাথ দাসের জীবন আমূল পরিবর্তিত হয়ে যায় ; পরবর্তীকালে  সন্ন্যাস নিয়ে তিনি রঘুনাথ দাস গোস্বামী নামে বৈষ্ণব জগতের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন।রঘুনাথ দাসের পর পানিহাটি নিবাসী রাঘব পণ্ডিত এই উৎসব করতেন । পরবর্তীকালে পানিহাটীর সেন পরিবার এই মহোৎসবের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।শ্রীরামকৃষ্ণকথামৃততে পাওয়া যায়, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও কয়েকবার এই মহোৎসবে যোগদান করেছিলেন। কথিত জাতি,বর্ণের ভেদ দূর করে গত প্রায় পাঁচশত বছরের সর্বজনীন মিলনমেলার  উৎসবটি এখনও অনুষ্ঠিত হয়ে চলছে।


শ্রীচৈতন্যদেবের সন্ন্যাস নেয়ার পরে বাংলার বৈষ্ণব সম্প্রদায়কে সংগঠিক করার দায়িত্ব এসে পরে শ্রীনিত্যানন্দের উপরে। তিনি তৎকালীন বিভিন্ন বর্ণ থেকে আগত বৈষ্ণবদের ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে তাদের মধ্যে জন্মগত জাতিবর্ণ ভেদের সংস্কার থেকে উপরে উঠে সবাইকে একসাথে ভোজনের শ্রীচৈতন্যদেবের সন্ন্যাস নেয়ার পরে বাংলার বৈষ্ণব সম্প্রদায়কে সংগঠিক করার দায়িত্ব এসে পরে এক সর্বজনীন মহোৎসবের প্রবর্তন করেন ; সেই সর্বজনীন মহোৎসবের নামই দণ্ড মহোৎসব।তৎকালীন ষোড়শ শতাব্দীতে বঙ্গের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিলো সপ্তগ্রাম। তার খ্যাতি ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। সেই সপ্তগ্রামের জমিদার ছিলেন দুইভাই হিরণ্য এবং গোবর্দ্ধন ; তাদের দুইভাইয়ের বাৎসরিক আয় ছিলো বারো লক্ষ টাকা। এমনি সুবিশাল সম্পত্তির মালিক দুইভাইয়ের মধ্যে গোবর্দ্ধনের একমাত্র পুত্র হলো রঘুনাথ দাস। যিনি পরবর্তীকালে ষড়গোস্বামীদের অন্যতম হয়েছিলেন।পুরী থেকে শ্রীনিত্যানন্দকে নাম প্রচারের দায়িত্ব দিয়ে বাংলায় পাঠালেন শ্রীচৈতন্যদেব। নিত্যানন্দ স্বপারিষদ এসে উঠলেন গঙ্গাপারের পানিহাটির রাঘবভবনে। প্রতিদিনই ভক্তদের সাথে নাম সংকীর্তনে মগ্নচৈতন্য থাকেন নিত্যানন্দ। একদিন নিত্যানন্দ দেখলেন জমিদার পুত্র রঘুনাথ দাস দূর থেকে তাকে প্রণাম করছে তখন রসিক নিতাই সহাস্যে রঘুনাথদাসকে কাছে টেনে এনে বলেন:
"তলে উপরে বহু ভক্ত হইয়াছে বেষ্টিত।
দেখিয়া প্রভুর প্রভাব রঘুনাথ বিস্মিত ৷৷
দণ্ডবৎ হইয়া পড়িলা বহুদূরে।
সেবক কহে রঘুনাথ দণ্ডবৎ করে।
শুনি প্রভু কহে চোরা দিলি দরশন।
আয় আয় আজি তোর করিব দণ্ডন।
প্রভু বোলায় তেঁহ নিকটে না করে গমন।
আকর্ষিয়া তার মাথে ধরিল চরণ।
কৌতুকী নিত্যানন্দ সহজে দয়াময়।
রঘুনাথে কহে কিছু হইয়া সদয় ৷৷
নিকটে না আইল চোরা ভাগে দূরে দূরে।
আজি লাগি পাইয়াছি দণ্ডিব তোমারে ।।
দধি চিড়া ভক্ষণ করাহ মোর গণে।
শুনিয়া আনন্দ হৈল রঘুনাথ-মনে ৷৷"
(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত: অন্ত্যলীলা, ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ)
নিত্যানন্দের আদেশ মত জমিদার পুত্র রঘুনাথ দাস প্রত্যেক ভক্তের জন্য মাটির হাড়িতে পর্যাপ্ত চিড়ে দই বিভিন্ন রকমের ফলের আয়োজন করেন।
"সেইক্ষণে নিজ লোক পাঠাইল গ্রামে।
লোক সব গ্রাম হইতে আনে ৷৷
চিড়া দধি দুগ্ধ সন্দেশ আর চিনি কলা।
সব দ্রব্য আনাইয়া চৌদিকে ধরিলা ।
মহোৎসব নাম শুনি ব্রাহ্মণ-সজ্জন।
আসিতে লাগিলা লোক অসংখ্য গণন।
আর গ্রামান্তর হইতে সামগ্ৰী আনিল।
শত দুই চারি তবে হোলনা আনাইল ৷৷
বড় বড় মৃৎকুণ্ডিকা আনাইলা পাঁচ সাতে।
এক বিপ্ৰ প্ৰভু লাগি চিড়া ভিজায় তাতে ।।
এক ঠাঞি তপ্ত দুগ্ধে চিড়া ভিজাইয়া।
অৰ্দ্ধেক ছানিল দধি চিনি কলা দিয়া ৷৷
অৰ্দ্ধেক ঘনাবৰ্ত্ত দুগ্ধেতে ছানিল।
চাঁপা কলা চিনি ঘৃত কর্পূর তাতে দিল ৷৷
ধুতি পরি প্রভু যদি পিণ্ডাতে বসিলা।
সাত কুত্তী বিপ্র তাঁর আগেতে ধরিলা ।।
চবুতরা উপরে যত প্রভুর নিজগণ।
বড় বড় লোক বসিলা মণ্ডলী-রচন ৷৷
রামদাস সুন্দরানন্দ দাস গদাধর।
মুরারি কমলাকর সদাশিব পুরন্দর।।
ধনঞ্জয় জগদীশ পরমেশ্বর দাস।
মহেশ গৌরদাস হোড় কৃষ্ণদাস ৷৷
উদ্ধারণ-আদি যত আর নিজ জন।
উপরে বসিলা সব কে করে গণন ৷৷"
(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত: অন্ত্যলীলা, ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ)
দিনটি ছিলো জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথি। সেই থেকে বৈষ্ণব সমাজে দিনটি ‘দণ্ড মহোৎসব’ নামে পরিচিত। ধনী ভক্তকে দিয়ে নিত্যানন্দ অর্থদণ্ডের ছলে মহোৎসবের আয়োজন করেছিলেন বলে এই উৎসবের নাম দণ্ড মহোৎসব। মূলত দণ্ডের ছলে কৃপাই এর প্রধান লক্ষ্য। বিষয়-সম্পত্তিকে লোককল্যাণে ব্যয় করে ভোগাসক্তি ত্যাগ করে জীবনে বৈরাগ্য নিয়ে আসা। নিত্যানন্দ প্রভুর এ দণ্ডে রঘুনাথ দাসের জীবন আমূল পরিবর্তিত হয়ে যায় ; পরবর্তীকালে সন্ন্যাস নিয়ে তিনি রঘুনাথ দাস গোস্বামী নামে বৈষ্ণব জগতের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন।রঘুনাথ দাসের পর পানিহাটি নিবাসী রাঘব পণ্ডিত এই উৎসব করতেন । পরবর্তীকালে পানিহাটীর সেন পরিবার এই মহোৎসবের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।শ্রীরামকৃষ্ণকথামৃততে পাওয়া যায়, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও কয়েকবার এই মহোৎসবে যোগদান করেছিলেন। কথিত জাতি,বর্ণের ভেদ দূর করে গত প্রায় পাঁচশত বছরের সর্বজনীন মিলনমেলার উৎসবটি এখনও অনুষ্ঠিত হয়ে চলছে।
সহকারী অধ্যাপক,সংস্কৃত বিভাগ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ।
সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ।
ফেসবুক পোস্ট লিঙ্ক : দণ্ড মহোৎসবের কথা
ফেসবুক পেজ লিঙ্ক : Shri Kushal Baran Chakraborty | Facebook
মন্তব্যগুলো দেখুনমন্তব্যগুলো লুকান🙁